ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি সত্যিই AI-এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?
একটা সময় ছিল, যখন মানুষ মনে করত ক্যালকুলেটর ব্যবহার করলে মাথার অঙ্ক নষ্ট হয়ে যাবে। এরপর এল ইন্টারনেট, বলা হলো এতে মানুষ বই পড়া ভুলে যাবে। আজ AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু “নির্ভরশীল হবে কি না” এটুকু নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কীভাবে এবং কোন পর্যায়ে নির্ভরশীলতা তৈরি হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন এক দুনিয়ায় বড় হবে, যেখানে AI কোনো আ
লাদা প্রযুক্তি নয়, বরং বাতাসের মতো অদৃশ্য কিন্তু সর্বত্র উপস্থিত একটি সঙ্গী।
শেখার পদ্ধতিই বদলে যাবেmr
আগামী প্রজন্ম স্কুলে গিয়ে শুধু বই মুখস্থ করবে না। তারা প্রশ্ন করবে, বিশ্লেষণ করবে এবং AI-এর সঙ্গে আলোচনা করবে। একজন শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত শেখার গতি অনুযায়ী AI টিউটর পাবে। যে বিষয়ে সে দুর্বল, AI সেখানে বেশি সময় দেবে। ফলে শেখা হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
এখানে নির্ভরশীলতা তৈরি হবে, কিন্তু সেটা অলসতার জন্য নয়। বরং শেখাকে আরও গভীর করার জন্য। তবে ঝুঁকিটা হলো, যদি চিন্তা করার প্রাথমিক দক্ষতা তৈরি হওয়ার আগেই সবকিছু AI-এর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে কৌতূহল কমে যেতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ায় AI-এর ছায়া
ভবিষ্যতে চাকরি বেছে নেওয়া, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, এমনকি জীবনসঙ্গী নির্বাচনেও AI পরামর্শ দেবে। ডেটার ভিত্তিতে AI বলবে, কোন সিদ্ধান্তে সফলতার সম্ভাবনা বেশি। এতে মানুষ নিরাপদ অনুভব করবে।
কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম সমস্যা আছে। মানুষ যদি সব সিদ্ধান্তের আগে AI-এর অনুমোদন খোঁজে, তাহলে নিজস্ব ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো কম ভুল করবে, কিন্তু কম আবিষ্কারও করবে।
সৃজনশীলতা কি হারিয়ে যাবে?
অনেকে ভাবেন AI থাকলে লেখক, শিল্পী, সংগীতশিল্পীদের দরকার থাকবে না। বাস্তবে চিত্রটা ভিন্ন। AI ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বেশি সৃজনশীল হতে উৎসাহিত করতে পারে। কারণ রুটিন কাজগুলো AI সামলাবে, মানুষ মন দেবে ভাবনায়।
তবে এখানেও নির্ভরশীলতার প্রশ্ন আসে। যদি প্রজন্ম শুধু AI দিয়ে লেখা, গান বা ছবি তৈরি করে, নিজে ভাবার অভ্যাস না গড়ে তোলে, তাহলে সৃজনশীলতা হবে ধার করা, নিজের নয়।
আবেগ ও মানবিক সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা
ভবিষ্যতে AI শুধু কাজের সঙ্গী নয়, আবেগের সঙ্গীও হবে। একাকীত্ব দূর করতে মানুষ AI-এর সঙ্গে কথা বলবে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এতে একদিকে মানসিক সহায়তা বাড়বে, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি মানুষের চেয়ে AI-কে বেশি নিরাপদ মনে করে, তাহলে সমাজের কাঠামোই বদলে যাবে।
নির্ভরশীলতা না সহযোগিতা?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দৃষ্টিভঙ্গি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম AI-এর উপর নির্ভরশীল হবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু সেটা কি অন্ধ নির্ভরতা, নাকি বুদ্ধিমান সহযোগিতা হবে, সেটাই মূল প্রশ্ন।
যদি AI-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শেখানো হয়, মালিক হিসেবে নয়, তাহলে এই নির্ভরশীলতা বিপজ্জনক হবে না। ঠিক যেমন বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনা করা যায় না, কিন্তু বিদ্যুৎ আমাদের মানুষ হওয়া কেড়ে নেয়নি।
শেষ কথা
AI ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন সহজ করবে, দ্রুত করবে এবং আরও সংযুক্ত করবে। তবে একই সঙ্গে এটি তাদের চিন্তা, অনুভূতি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নতুন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম AI-এর উপর নির্ভরশীল হবে, এতে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন একটাই, তারা কি AI দ্বারা চালিত হবে, নাকি AI-কে চালাবে?
উত্তরটাই আগামী সময়ের মানবসভ্যতার দিক নির্ধারণ করবে।

Comments
Post a Comment