রোজেলা: এক নীরব উদ্ভিদ, বহুস্তর গল্প
রোজেলা নামটা শুনলে অনেকের মাথায় প্রথমে আসে লালচে এক ধরনের পানীয় বা টক-মিষ্টি স্বাদের শরবত। কিন্তু এই গাছটি শুধু একটি পানীয়ের কাঁচামাল নয়। রোজেলা আসলে এমন এক উদ্ভিদ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে খাবার, স্বাস্থ্য, কৃষি, সংস্কৃতি এবং সময়ের সাথে মানুষের অভিযোজনের গল্প। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গল্পগুলো প্রায়ই আলাদা আলাদা করে বলা হয়, একসাথে নয়।
রোজেলার বৈজ্ঞানিক নাম Hibiscus sabdariffa। এটি মালভেসি পরিবারভুক্ত, অর্থাৎ জবা ফুলের কাছাকাছি আত্মীয়। তবে রোজেলার চরিত্র জবার মতো শুধু সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতিটি অংশ, পাতা, ফুলের বৃতি, বীজ এমনকি কান্ডও ব্যবহারযোগ্য। খুব কম গাছ আছে যেগুলো এতটা সর্বাঙ্গে কার্যকর।
রোজেলা গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর লাল রঙের বৃতি, যাকে অনেকেই ভুল করে ফুল মনে করেন। প্রকৃত ফুল ঝরে যাওয়ার পর এই বৃতি ধীরে ধীরে মোটা হয় এবং তখনই সংগ্রহ করা হয়। এই বৃতির রঙ শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়। এই রঙের ভেতরে আছে প্রাকৃতিক অ্যান্থোসায়ানিন, যা উদ্ভিদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ রোজেলা নিজের শরীরকে রক্ষা করতে গিয়ে এমন এক উপাদান তৈরি করেছে, যা মানুষও নিজের শরীরের উপকারে লাগাচ্ছে।
একটি কম আলোচিত তথ্য হলো, রোজেলা আসলে খরা সহনশীল গাছ। অল্প পানিতেই এটি ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যেখানে অন্য অনেক ফসল পানির অভাবে নষ্ট হয়ে যায়, সেখানে রোজেলা টিকে থাকতে পারে। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে যে চ্যালেঞ্জ আসছে, রোজেলার মতো গাছ সেখানে নীরব সমাধান হতে পারে।
রোজেলার পাতা অনেক দেশে শাক হিসেবে খাওয়া হয়। স্বাদে হালকা টক, কিন্তু রান্নার পর তা গভীরতা পায়। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে রোজেলা পাতা দিয়ে এমন সব খাবার তৈরি হয়, যা শুধু পুষ্টিকর নয় বরং দীর্ঘ সময় পরেও শরীরকে হালকা রাখে। এই পাতায় থাকা প্রাকৃতিক অ্যাসিড হজম প্রক্রিয়াকে ধীর কিন্তু স্থির রাখে। ফলে শরীর ক্লান্ত হয় না।
আরেকটি প্রায় অজানা দিক হলো রোজেলার বীজ। সাধারণত আমরা বীজ ফেলে দিই। কিন্তু এই বীজে আছে ভালো মানের প্রোটিন ও তেল। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, রোজেলা বীজ থেকে পাওয়া তেল রান্নার তেলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। তেলের স্বাদ নিরপেক্ষ হওয়ায় এটি খাবারের স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট করে না। গ্রামীণ পর্যায়ে এটি একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ হতে পারে।
রোজেলার কান্ড থেকে আঁশ পাওয়া যায়, যা দেখতে অনেকটা পাটের মতো। এই আঁশ দিয়ে দড়ি, মোটা কাপড় এমনকি পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ রোজেলা শুধু খাদ্য নয়, এটি একটি শিল্পকাঁচামালও। এক গাছ, বহু ব্যবহার এই ধারণার জীবন্ত উদাহরণ রোজেলা।
সংস্কৃতির দিক থেকেও রোজেলার অবস্থান আলাদা। অনেক দেশে এটি উৎসবের পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। লাল রঙের কারণে এটি আনন্দ, প্রাণশক্তি ও নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সাংস্কৃতিক অর্থ তৈরি হয়েছে মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে, কোনো ধর্মীয় নির্দেশ থেকে নয়। মানুষ রোজেলা পান করে ভালো অনুভব করেছে, সেখান থেকেই এর উৎসবীয় অবস্থান।
রোজেলার আরেকটি নীরব ভূমিকা আছে। এটি মাটির গুণমান উন্নত করতে সাহায্য করে। এর শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে শক্ত স্তর ভেঙে দেয়। ফলে পরবর্তী ফসলের জন্য মাটি নরম ও উর্বর হয়। অনেক কৃষক না জেনেই রোজেলাকে প্রাকৃতিক মাটির চিকিৎসক হিসেবে ব্যবহার করছেন।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, রোজেলা কোনো আড়ম্বর চায় না। এটি শহরের বিলাসী গাছ নয়, আবার একে পুরোপুরি গ্রাম্যও বলা যায় না। এটি এমন এক উদ্ভিদ, যা মানুষের সাথে নীরবে সহাবস্থান করে। খুব বেশি দাবি করে না, আবার দেওয়ার সময় হিসাবও রাখে না।
রোজেলাকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শুধু শরবতের উপকরণ হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ হিসেবে। এর গল্প আসলে আমাদেরই গল্প। কম সম্পদে টিকে থাকা, নিজেকে বদলে নেওয়া এবং অন্যের উপকারে আসা। এই গুণগুলোই রোজেলাকে সাধারণ গাছের ভিড় থেকে আলাদা করে তোলে।

Comments
Post a Comment