রোজেলা এমন একটি চা যার সাধ না নিলে কল্পনা করাই যায়। এ চায়ের স্বাদ কিছুটা টক হলেও মনকে শান্ত করে দেয়।
রোজেলা চা নিয়ে সাধারণত আমরা জানি এটি টক স্বাদের, লালচে রঙের, অনেকেই হয়তো জানে না টকশাদের চা হয় ।শরীর ঠান্ডা করে। কিন্তু রোজেলা চায়ের ভেতরে এমন কিছু নীরব গল্প আছে, যেগুলো চায়ের কাপের বাইরে খুব কমই এসেছে। পৃথিবীর অনেকাংশ মানুষই জানে না এই চায়ের স্বাদ এবং উপকারিতা।
রোজেলের সৌন্দর্য হলো তার রং। প্রথম অজানা দিকটি শুরু হয় রোজেলার রঙ বদলের অভ্যাস দিয়ে। রোজেলা চা আসলে এক ধরনের প্রাকৃতিক সময়ঘড়ি। চা ঢালার পর যে লাল রঙ দেখা যায়, সেটি স্থির থাকে না। বাতাস, তাপমাত্রা আর পানির খনিজ উপাদানের ওপর নির্ভর করে রঙ ধীরে ধীরে গাঢ় হয় বা হালকা হয়। একই রোজেলা, একই পরিমাণ, কিন্তু ভিন্ন জায়গার পানিতে করলে রঙ আলাদা দেখাবে। একে বলা যায় রোজেলার নীরব রঙ-সংলাপ।
দ্বিতীয় বিষয়টি স্বাদের স্মৃতি। রোজেলা চা শুধু জিভে টক লাগে না, এটি স্মৃতির সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে। যারা দীর্ঘদিন চিনি ছাড়া রোজেলা পান করেন, তাদের কাছে চা ধীরে ধীরে কম টক লাগে। অর্থাৎ রোজেলা চা স্বাদ বদলায় না, বদলায় পানকারীর স্বাদ গ্রহণের মানসিকতা। খুব কম পানীয় আছে, যেটি নিয়মিত খেলে নিজের স্বাদকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়।
তৃতীয় অজানা তথ্যটি হলো রোজেলা চায়ের শব্দ। গরম পানিতে শুকনো রোজেলা পাপড়ি ফেললে হালকা ফিসফিস শব্দ হয়, যেটা সাধারণত কেউ খেয়াল করে না। এই শব্দ আসলে কোষের ভেতরে আটকে থাকা বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার সংকেত। একে বলা যায় রোজেলার ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস। রান্নাঘরের নীরবতায় এই শব্দ শোনা গেলে বোঝা যায়, চা ঠিকভাবে জেগে উঠছে।
চতুর্থ দিকটি সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক। রোজেলা চা সকাল আর সন্ধ্যায় এক রকম লাগে না। সকালে এটি বেশি সতেজ মনে হয়, সন্ধ্যায় বেশি প্রশান্ত। কারণ আমাদের শরীরের অ্যাসিড-বেস ভারসাম্য দিনভেদে বদলায়, আর রোজেলা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। একই চা, ভিন্ন সময়, ভিন্ন অনুভূতি।
পঞ্চম তথ্যটি আবেগঘন। রোজেলা চা চাপা কণ্ঠে কাজ করে। এটি তাৎক্ষণিক চাঙ্গা না করে ধীরে ধীরে মনকে স্থির করে। যারা নিয়মিত পান করেন, তারা লক্ষ্য করবেন রোজেলা পান করার সময় কথা বলার গতি কমে আসে। যেন চা আপনাকে অজান্তেই ধীর হতে শেখায়।
আরেকটি প্রায় অজানা বিষয় হলো রোজেলা চায়ের দ্বিতীয় জীবন। একবার চা বানানোর পর যে পাপড়িগুলো ফেলে দেওয়া হয়, সেগুলোতে এখনো রঙ আর সুবাস থাকে। দ্বিতীয়বার হালকা গরম পানিতে দিলে আলাদা এক ধরনের নরম স্বাদ পাওয়া যায়, যেটা প্রথম কাপের চেয়ে বেশি মাটির কাছাকাছি। একে বলা যায় রোজেলার শান্ত সংস্করণ।
সবচেয়ে অদ্ভুত দিকটি হলো রোজেলা চায়ের নীরব শৃঙ্খলা। খুব বেশি ফুটালে এটি রাগী হয়ে যায়, খুব কম ফুটালে কথা বলে না। রোজেলা চা আপনাকে শেখায় মাঝামাঝি পথের গুরুত্ব। না তাড়াহুড়া, না অবহেলা।
এই কারণেই রোজেলা চা শুধু একটি পানীয় নয়। এটি সময়, রঙ, শব্দ আর অনুভূতির একসাথে বসে থাকা একটি অভিজ্ঞতা। যে অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে খুলে যায়, যদি আপনি একটু থেমে চায়ের দিকে তাকান।

Comments
Post a Comment