ফাল্গুনে রূপচর্চা মানে শুধু রঙিন শাড়ি, খোঁপায় ফুল আর হালকা মেকআপ নয়। এই ঋতুটা আসলে ত্বক, মন আর অভ্যাসের এক নীরব চুক্তি। শীতের শুষ্কতা তখনো পুরোপুরি যায়নি, গরমের ক্লান্তিও আসেনি। ঠিক এই মাঝখানের সময়টাই রূপচর্চার সবচেয়ে অবহেলিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ফাল্গুনে ত্বক হঠাৎ বদলে যায়। সকালে আয়নায় যে মুখটা দেখা যায়, বিকেলে সেটা আর একরকম থাকে না। কারণ বাতাসে তখন অদ্ভুত এক মিষ্টতা। সকালে ঠান্ডা, দুপুরে রোদ, সন্ধ্যায় আবার হালকা শীত। এই ওঠানামায় ত্বক বিভ্রান্ত হয়। বেশিরভাগ মানুষ তখন আগের মৌসুমের প্রসাধনী আঁকড়ে ধরে। এটাই প্রথম ভুল। ফাল্গুন মানে স্কিনকেয়ারের ট্রানজিশন। ভারী ক্রিমের জায়গায় হালকা ময়েশ্চার, কিন্তু একেবারে ছেড়ে দেওয়া নয়। ত্বককে তখন শেখাতে হয় কিভাবে নিজে নিজে ব্যালান্স করতে হয়।
এই সময়ে রূপচর্চার সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে পানি খাওয়ার অভ্যাসে। ফাল্গুনে তৃষ্ণা কম লাগে, তাই মানুষ পানি কম খায়। অথচ ত্বক তখন ভেতর থেকে শুকোতে শুরু করে। বাইরে তেলতেলে ভাব এলেও ভেতরে ডিহাইড্রেশন কাজ করে। ফলে ব্রণ, ছোট ছোট র্যাশ বা অকারণ নিস্তেজ ভাব দেখা দেয়। ফাল্গুনের আসল রূপচর্চা শুরু হয় গ্লাসে ভরা পানির সঙ্গে, ড্রেসিং টেবিলে নয়।
চুলের ক্ষেত্রেও এই ঋতু চুপচাপ ক্ষতি করে। বাতাসে ধুলো বাড়ে, ঘাম শুরু হয়, আবার শীতের কারণে স্কাল্প পুরোপুরি ঘামতে পারে না। অনেকেই এই সময় অতিরিক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করে থাকেন। ফলাফল, চুল আরও রুক্ষ হয়ে যায়। ফাল্গুনে চুল চায় বিশ্রাম। সপ্তাহে একদিন হালকা তেল, কিন্তু রাতভর নয়। আধাঘণ্টা যথেষ্ট। এটুকু সময়ই চুলকে বলে দেয়, তুমি যত্ন পাচ্ছো। এতোটুকু করলেই যথেষ্ট।
রূপচর্চার কথা বলতে গেলে আমরা প্রায়ই ত্বক আর চুলেই থেমে যাই। অথচ ফাল্গুনে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত থাকে ঠোঁট আর হাত। ঠোঁটে তখন শুষ্কতা দেখা দেয়, কিন্তু রোদে পোড়ার মতো লাগে না বলে আমরা গুরুত্ব দিই না। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই ঠোঁটের রঙ নিস্তেজ হয়ে যায়। রাতে ঘুমানোর আগে সামান্য ঘি বা মধু, এর বেশি কিছু দরকার হয় না। হাতের ক্ষেত্রেও একই কথা। বারবার সাবান ব্যবহার, ধুলো, রোদ সব মিলিয়ে হাত বুড়িয়ে যায় দ্রুত। ফাল্গুনে হাতের যত্ন মানে ভবিষ্যতের ত্বককে বাঁচানো। নিজেকেও সতেজ রাখুন।
এই ঋতুতে রূপচর্চার আরেকটা দিক আছে, যেটা প্রায় কেউ লেখে না। সেটা হলো গন্ধ। ফাল্গুন মানেই ফুলের গন্ধ, বাতাসে মিষ্টি একটা আবেশ। কিন্তু ভারী পারফিউম একদম ব্যবহার করবেন না করলেএই সময়ে উল্টো কাজ করে। হালকা, নরম সুগন্ধই ফাল্গুনের সৌন্দর্য বাড়ায়। এমন গন্ধ, যেটা কাছে এলে বোঝা যায়, দূর থেকে নয়। যা করলে নিজেকে সবসময়ই সতেজ মনে হয়।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ফাল্গুনে আয়নায় নিজেকে বেশি ভালো লাগে ফাল্গুনের বাতাস মনকে জাগিয়ে তোলা। এই ভালো লাগাটাই অনেক সময় অলস করে দেয়। আমরা ভাবি, এমনিতেই তো ভালো দেখাচ্ছে। অথচ এই সময়ের ছোট ছোট যত্নই ঠিক করে দেয় গ্রীষ্মে আপনার ত্বক কেমন থাকবে। ফাল্গুন আসলে প্রস্তুতির ঋতু। রূপচর্চার পরীক্ষাগার। নিজেকে যতোটুকু পরিপাটি করে ফেলবে ততই শান্তি অনুভব করবে।
ফাল্গুনের রূপ মানে শুধু বাহ্যিক সাজ নয়। এই সময় নিজেকে একটু হালকা রাখা, কম অভিযোগ করা, বেশি হাসা। কারণ মন ভালো না থাকলে এই ঋতু সব ত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ফাল্গুন কাউকে জোর করে সুন্দর করে না। সে শুধু সুযোগ দেয়। সেই সুযোগটা নেবে কিনা, সেটা পুরোপুরি আপনার হাতে। আর ফাল্গুন নিজেই নিজের সৌন্দর্য টাকে উপস্থাপনা করে প্রকৃতির মাধ্যমে।
ফাল্গুনে রূপচর্চা আসলে আয়নার জন্য নয়, নিজের ভেতরের ছন্দ ঠিক করার জন্য।এই ঋতু শেখায়, অল্প যত্নই কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য তৈরি করে। নিজেকে প্রফুল্ল রাখে সবসময়।

Comments
Post a Comment